পঞ্চদশ অধ্যায়: পাঠশালার মধুর পাঠ আওয়াজ

পশ্চিম জিন সাম্রাজ্যের শেষ দিনে টিকে থাকার সংগ্রাম পাগল ১৬১৪১৪ 2804শব্দ 2026-03-04 18:54:40

প্রহরী দলের প্রশিক্ষণ পরিদর্শন শেষ করে, ওয়েই শুয়ো নতুন করে নির্মিত পাঠশালায় এলেন। যদিও একে পাঠশালা বলা হয়, আসলে এটি ছিল মাত্র দুটি কাঠের ঘর, ভেতরে কয়েকটি কাঠের বেঞ্চ সাজানো ছিল টেবিলের বদলে, দুই-তিন ডজন শিশু সেখানে বসে মাথা দুলিয়ে পাঠ্যাংশ মুখস্থ করছিল। কাগজ-কলমের অভাবে, তারা বালিতে অক্ষর চর্চা করতো। দুইজন শিক্ষক পাথরের চুন দিয়ে তৈরি চক ব্যবহার করে শিশুদের পাঠ দিতেন। বইয়ের অভাবে তাঁরা কেবল মৌলিক অক্ষর শেখাতেন, প্রতিটি অক্ষর অনেকবার পুনরাবৃত্তি করতেন।

ওয়েই শুয়ো ও ঝু ওয়েন রাস্তা ধরে হাঁটার সময় দূর থেকে পাঠ্যপাঠের গলা শোনা যাচ্ছিল। পাঠশালার সরলতা দেখে ওয়েই শুয়ো হাসিমুখে বললেন, ‘‘এখন আমাদের সামর্থ্য সীমিত, আপাতত শিশুদের কিছুটা কষ্ট স্বীকার করতে হচ্ছে। অচিরেই যদি আমাদের টাকা হয়, তাদের জন্য বই ও কাগজ-কলম জোগাড় করব।’’

‘‘আকাশ, পৃথিবী—শুরু থেকে চিরন্তন...’’

শিশুদের জোরে পাঠ্যপাঠ শুনে ঝু ওয়েনের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে হাসতে হাসতে বলল, ‘‘সভাপতি, আপনি যে ‘সহস্রবাক্য’ শিক্ষকদের শিখিয়েছেন, তা চমৎকার। জানি না, এই অনন্য কাব্য কোন মহামান্য পণ্ডিতের রচনা।’’

ওয়েই শুয়ো হালকা হাসলেন, কোন ব্যাখ্যা দিলেন না। এই ‘সহস্রবাক্য’-এর জন্য তিনি তার ছোট ভাতিজার কাছে কৃতজ্ঞ। ভাই-ভাবি চাকরির ব্যস্ততায় ছুটি পেলেই ভাতিজার পড়াশোনার দায়িত্ব তাঁর ওপর থাকত। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘ত্রিবাক্যসূত্র’, ‘সহস্রবাক্য’, ‘শতগোত্র’, ‘শিষ্যনীতি’ ইত্যাদি শিশুপাঠ্য তিনি মুখস্থ করে ফেলেছিলেন। যেহেতু ‘ত্রিবাক্যসূত্র’-এর অধিকাংশ উপাখ্যান তখনও ঘটেনি, তাই তিনি ‘শতগোত্র’ ও ‘সহস্রবাক্য’ পড়াতে শুরু করলেন।

‘‘সূর্য-চন্দ্র উজ্জ্বল, নক্ষত্র পরপর সাজানো...’’—ছন্দে ভরা কণ্ঠে পাঠ্যপাঠের শেষে শিশুদের কচি গলা শোনা গেল। তাদের পাঠ্যপাঠ পাহাড়ি উপত্যকায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। বসন্তের স্বচ্ছ সুরের মতো নির্মল, যা শুনলে অন্তর পরিশুদ্ধ হয়ে যায়।

জানালা দিয়ে তাকালে দেখা যায়, সাত-আট বছরের বেশ ক’জন শিশু মনোযোগ দিয়ে শিক্ষকের সঙ্গে পাঠ্যপাঠ করছে। মঞ্চে, মোটা কাপড়ের পোশাক পরা বৃদ্ধ শিক্ষক হাতে শাস্তির কাঠি নিয়ে ক্লাসের এদিক ওদিক ঘুরছেন। কারো মনোযোগ না থাকলে কড়া মুখে তার মাথায় হালকা আঘাত করতেন।

বাচ্চারা চমকে উঠে সোজা হয়ে বসত, ফের মাথা দুলিয়ে পাঠ্যপাঠ শুরু করত। কিছুক্ষণ পড়ার পর কেউ কেউ জানালার বাইরে উঁকি দিতে চাইত কৌতূহলে, সুযোগ বুঝে শিক্ষক না দেখলে চুপিচুপি তাকাত।

‘‘সভাপতি, আমরা কি ভেতরে যাব?’’ ঝু ওয়েন ওয়েই শুয়োর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।

ওয়েই শুয়ো স্থির চাহনিতে পাঠশালার দিকে তাকালেন, অনেকক্ষণ চুপ থেকে মাথা নাড়লেন, ‘‘না, শিশুদের ক্লাসে বিঘ্ন ঘটাবো না। এসো, এবার আমরা উদ্বাস্তুদের বাড়ি দেখে আসি।’’

‘‘শিক্ষক, সভাপতি চলে গেছেন!’’

শিক্ষক জানালার বাইরে তাকালেন, ওয়েই শুয়ো ও ঝু ওয়েন দূরে চলে যেতে দেখে হাসিমুখে বললেন, ‘‘ভালো, সবাই আবার পাঠ্যপাঠ শুরু করো।’’

‘‘শিক্ষক, আমি কি বড় হলে সভাপতির মতো মহানায়ক হতে পারব?’’ ছোট্ট ছেলেটির চোখে উত্তেজনার আলো জ্বলছিল, সে মুষ্টি শক্ত করে শিক্ষককে জিজ্ঞেস করল।

‘‘নিশ্চয়ই পারবে! যদি সবাই মন দিয়ে পড়াশোনা করে, ভবিষ্যতে সভাপতির মতো মহানায়ক হওয়া অসম্ভব নয়।’’ শিক্ষক দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়লেন।

‘‘সত্যি?’’ ছেলেটি আনন্দে চিৎকার করল, ‘‘তাহলে আমি অবশ্যই মন দিয়ে পড়ব।’’

শিক্ষক হাসিমুখে মাথা নাড়লেন, জানালার বাইরে যাদের ছায়া মিলিয়ে গেল, সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ছেলেটির মাথায় স্নেহে হাত বুলিয়ে দিলেন।

এ সময় দুপুর ঘনিয়ে এসেছে, প্রতিটি বাড়িতে রান্নার ধোঁয়া উঠছে, আকাশে ধোঁয়ার সরু রেখা মিলিয়ে যাচ্ছে।

পাঠশালার ভেতর পড়ার শব্দ এখনো গম্ভীরভাবে উপত্যকার নীরব আকাশে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

...

‘‘জিউ ওয়েন, তুমি তো বিদ্বান, কেমন করে উদ্বাস্তুর দলে নাম লেখালে? তুমি কি আমলা হতে পারতে না?’’ হঠাৎ রাস্তা চলতে চলতে ওয়েই শুয়ো কৌতূহলে জিজ্ঞেস করলেন।

ওয়েই শুয়োর এই প্রশ্ন অস্বাভাবিক নয়। তিনি জানতেন, ওয়েই-জিন যুগে শিক্ষার অধিকাংশ সুযোগ ছিল অভিজাত পরিবারের হাতে। যারা পড়াশোনা করত, তারা বা তাদের পরিবার কোনো না কোনোভাবে সেই অভিজাতদের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সাধারণ জনগণের পড়াশোনার কোনো সুযোগ ছিল না।

তখনকার যুগে, পড়ুয়া মানুষ ছিল দুর্লভ। ঝু ওয়েনের মতো কেউ উদ্বাস্তুর দলে নাম লেখালে, তা সত্যিই ব্যতিক্রম।

‘‘আমি সাধারণ পরিবারের সন্তান। এমনকি নিম্নতম স্তরে স্থান পেতেও পারিনি, সরকারি চাকরির সুযোগ কই?’’ ঝু ওয়েনের মুখে যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠল।

‘‘এই ‘নবস্তর নির্ধারণ’ ব্যবস্থা আসলে কী?’’ ওয়েই শুয়ো জানতেন, এটা ওয়েই-জিন যুগের প্রতিভা বাছাইয়ের পদ্ধতি, এবং পরবর্তী সকল যুগের আমলাদের স্তরবিন্যাসের উৎস।

ঝু ওয়েন মুখ বিকৃত করে বলল, ‘‘নবস্তর ব্যবস্থা হলো অভিজাতদের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার। তারা নিজেদের স্বার্থে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আমলাতন্ত্র নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়।’’

‘‘তবে কি রাজসভা কিছুই করে না?’’

‘‘রাজসভা? ধুর! রাজসভা থেকে শুরু করে রাজা পর্যন্ত সবাই সেই অভিজাতদেরই অংশ। নবস্তর নির্ধারণের জন্য যারা নিয়োজিত, তারাও তাদেরই লোক। এখনকার রাজসভার এই অবস্থার জন্য নবস্তর ব্যবস্থা অনেকটাই দায়ী।’’

‘‘বলা হয়, নবস্তর ব্যবস্থা পরিবার, নৈতিকতা ও কৃতিত্বের ভিত্তিতে স্থর নির্ধারণ করে। কিন্তু সত্যি বলতে, পরিবারই আসল। অন্য কৃতিত্ব বা নৈতিকতা কেবল দেখানোর জন্য। যদি কেউ আদর্শ লঙ্ঘন করে শুধু মেধার ভিত্তিতে স্থান পায়, সে হয় কোনো অভিজাত পরিবারের ঘনিষ্ঠ নয়তো সাধারণ পরিবারের সন্তানদের কোনো সুযোগ নেই।’’

ওয়েই শুয়ো চিন্তিত মুখে চুপ করে থাকলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, ‘‘ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে, আমি চাই আরেকটা পদ্ধতিতে প্রতিভা বাছাই করা হোক।’’

ঝু ওয়েন চমকে উঠে বলল, ‘‘আরেকটা পদ্ধতি? দুই হান যুগের ‘পরীক্ষা ও সুপারিশ’ ছাড়া আমি তো এই নবস্তর ছাড়া কিছু শুনিনি। সভাপতির কি তবে মহান সম্রাট চাও চাওর সেই ‘যোগ্যতাভিত্তিক নির্বাচন’-এর পুনরুজ্জীবনের ইচ্ছা?’’

ওয়েই শুয়ো হাসলেন, ‘‘চাও চাওর ‘যোগ্যতাভিত্তিক নির্বাচন’ অবশ্যই বিশাল অগ্রগতি, বিশেষ করে সেখানে পরিবার নয়, যোগ্যতাই আসল। কিন্তু চাও চাও সবটুকু বাস্তবায়ন করতে পারেননি। সুযোগ এলে আমরা統一 পরিক্ষার মাধ্যমে প্রতিভা বাছাই করব।’’

‘‘পরীক্ষা?’’ ঝু ওয়েন কিছুই বুঝল না।

‘‘হ্যাঁ, পরীক্ষা। একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রশ্ন তৈরি ও পরীক্ষা পরিচালনা করবে। যে কেউ, পরিবারের অবস্থা যাই হোক, পরীক্ষা দিতে পারবে। খাতা বিশেষ ব্যক্তিরা মূল্যায়ন করবে এবং খাতার ওপর সব নাম ঢেকে রাখা হবে, ফলে ফলাফল না আসা পর্যন্ত কেউ জানবে না কার খাতা সেটা।’’

ঝু ওয়েন উজ্জ্বল চোখে বলল, ‘‘সভাপতি, এই উপায় চমৎকার! এতে অভিজাতদের একচেটিয়া অধিকার থাকবে না, সাধারণ পরিবারের শিক্ষার্থীও সুযোগ পাবে। এই পরিকল্পনা অসাধারণ!’’

ওয়েই শুয়ো হাত তুলে বললেন, ‘‘এটা কেবল আমার মনের ভাবনা, বাস্তবায়নের পথ অনেক দূর। এখনো আমাদের সে ক্ষমতা নেই। তবে ভবিষ্যতে সুযোগ এলে চাই তুমি আমাকে এই পরীক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করবে।’’

‘‘সত্যি? সভাপতি যদি এমন মহৎ লক্ষ্য স্থির করেন, আমি জীবনভর আপনার পাশে অবিচল থেকে থাকব।’’

ঝু ওয়েন আবেগে ওয়েই শুয়োর সামনে হাঁটু গেড়ে শপথ করল।

‘‘এ কি করছ! উঠো, তুমি জানো আমি এই হাঁটু গেড়ে থাকা একদম পছন্দ করি না।’’ ওয়েই শুয়ো তাড়াতাড়ি ঝু ওয়েনকে টেনে তুললেন। আধুনিক মানুষ হিসেবে, প্রাচীন যুগে এসে খাওয়া-দাওয়ার কিছু অসুবিধা ছাড়া, তিনি সবচেয়ে অপছন্দ করতেন সবাইকে বারবার তার সামনে হাঁটু গেড়ে পড়তে।

আসলে, ওয়েই শুয়ো বুঝতে পারতেন না, ঝু ওয়েনের মতো প্রাচীন কালের মানুষের মনের অবস্থা। ঝু ওয়েনের কাছে, ইতিহাসে নাম রেখে যাওয়ার দায়িত্ব পাওয়া ছিল সর্বোচ্চ বিশ্বাস। যেমন প্রবাদ বলে, ‘‘রাজপুরুষ আমাকে সম্মান দিলে, আমিও রাজপুরুষের মতো সেবা করব।’’ প্রাচীন অনেক পণ্ডিতের মনেও ঠিক এই রকম অনুভূতি বাস করত।