পঁচিশতম অধ্যায় সুন্দর দিদি, একটু দাঁড়াও
তাদের দু’জন ছাড়া, বাকিরাও গল্পে মেতে উঠল। কেউ কেউ প্রথমবারের মতো একে অপরের মুখোমুখি হয়েছে, আবার কেউ কেউ আগে থেকেই পরিচিত। সত্যি বলতে, এত কাকতালীয় ঘটনা—একসঙ্গে একই কাহিনিতে প্রবেশ করা! সবাই নিজেদের দোকান নিয়ে গল্প করছিল। কেউ কেউ খাবার বিভাগের দায়িত্বে, সেখানে আছে রেস্তোরাঁ, চাউমিনের দোকান, গ্রিলড ফিশের দোকান ইত্যাদি। কেউ একজন আবার সিনেমা হলে স্থান পেয়েছে, শোনা যায় সেখানে শুধু ভূতের ছবি! মনে হচ্ছে, এইসব অশুভ আত্মাদের জন্য ভূতের ছবি দেখানোরই ব্যবস্থা। মোটকথা, বিপনীবিতানের দোকানপাট বিচিত্র, প্রায় প্রতিটি কোণায় কাউকে না কাউকে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।
তবে পুরো বিপনিবিতানে, বাইরের ভিতরে ঢুকতে না-পারা অশুভ আত্মাদের ছাড়া, ভেতরে একটাও ভূত বা দানব চোখে পড়ছে না। কেউ কেউ বলল, ‘‘এটা কী অবস্থা, আমাদের তো বলা হয়েছে আমরা দোকানদার, তাহলে কোনো কর্মচারী নেই কেন? আর কর্মঘণ্টাও তো নির্দিষ্ট করা হয়নি…’’ আরেকজন বলল, ‘‘কর্মচারী না থাকাই তো ভালো! এই ভূতের দুনিয়ায় যদি কর্মচারী থাকত, তবে তারা নিশ্চয়ই মানুষ হতো না। ওরা কি শান্ত হয়ে কাজ করবে? বরং আমাদের নানা ঝামেলায় ফেলবে!’’
‘‘হ্যাঁ, ঠিক কথা!’’
‘‘ভূতদের দিয়ে দোকান চালানোর চেয়ে একলা দোকানদার হয়ে থাকাই ভালো।’’
‘‘নিজেই সব কাজ করলেও, ভূতের ভিড়ে পড়ার চেয়ে তা ঢের শ্রেয়।’’
‘‘কে জানে, এসব ভূতের কী মতলব!’’
‘‘ঠিকই তো! ভুলে যেয়ো না, এইবারের কাজ কী—বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা!’’
‘‘আর প্রতিদিনই তো একটা করে লক্ষ্য নির্ধারণ করা আছে!’’
‘‘হ্যাঁ, প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে, আর সেটা পূরণ করলেই সেই দিনের কাজ শেষ!’’
‘‘তাছাড়া, যত বেশি বিক্রি হবে, পুরস্কারও তত ভালো হবে!’’
‘‘বাপরে! এটা তো আমাদের নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় নামাতে চাইছে!’’
তৎক্ষণাৎ কেউ কেউ বুঝতে পারল। যদিও প্রতিদিন লক্ষ্য পূরণ করলেই দিনের কাজ শেষ, কিন্তু কোথাও তো বলা হয়নি কাজ শেষ হলেই আর কিছু বিক্রি করা যাবে না! বিশেষ করে, ওই বাক্যটি—‘‘বিক্রি যত ভালো, পুরস্কার তত ভালো’’—স্পষ্টতই জানিয়ে দিচ্ছে, চূড়ান্ত পুরস্কার নির্ভর করছে বিক্রির উপর। কে না চায়, তার পুরস্কার আরও ভালো ও বেশি হোক? সেই আশায় নিশ্চয়ই কেউ কেউ সর্বোচ্চ বিক্রি করতে চাইবে। আর ‘‘ভালো’’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, এই মানদণ্ড-ই বা কী? যদি সবাই সমান হয়, তবে ভালো-মন্দের পার্থক্যই বা হবে কেমন করে? তাই, কেউ না কেউ সর্বোচ্চ বিক্রির জন্য মরিয়া হবে। এটা যে প্রতিযোগিতার জন্যই বানানো, সে তো স্পষ্ট।
এমন সময়, কর সুশান্তের পাশে দাঁড়ানো এক খেলোয়াড়, ফু মু চিয়ান, হঠাৎ উচ্চস্বরে বলে উঠল। সে হাতে একটি বড় রেঞ্চ তুলে ধরে বলল, ‘‘সবাই, আমার কথা শুনুন!’’
‘‘তুই আবার কে?’’—কেউ একজন বিরক্ত গলায়।
‘‘আমি ফু মু চিয়ান।’’
প্লাম্বারের পোশাক পরা, হাতে রেঞ্চ, নামও ফু মু চিয়ান—সবাই মনে মনে অবাক। সবাই চুপ করলে, ফু মু চিয়ান বলল, ‘‘আমার মনে হয়, এটা নিশ্চয়ই ভূতদের কোনো চক্রান্ত। আমরা সবাই খেলোয়াড়, আমাদের নিজেদের মধ্যেই ঐক্য থাকতে হবে! প্রতিযোগিতা করো, কিন্তু বাড়াবাড়ি করে নয়। চলো, একটা সীমা বেঁধে দিই…’’
তখনই, ফু মু চিয়ান কথা শেষ করার আগেই, উপর থেকে তালি পড়ল।
একই সঙ্গে, গা ছমছমে শীতল হাওয়া ভরপুর হয়ে উঠল বিপনিবিতানে, অশুভ আত্মার প্রবল দাপটে উপস্থিত সবাই কেঁপে উঠল। মনে হল, শীতল একটা স্রোত পা বেয়ে মাথা পর্যন্ত উঠে গেল। ভূতীয় শক্তির এমন চাপ, সকলেই শ্বাস নিতে কষ্ট পেল। সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।
দেখল, সুশ্রী পোশাক পরা, চওড়া কাঁধে স্যুট আর সোনালি ফ্রেমের চশমা পরা, চুল গুছিয়ে আঁটা, চকচকে জুতা পরে, একদলীয় তেজী ভূত ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নামছে। প্রতি ধাপে, তার উপস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়। এই ভূতটি যেন এক সফল ব্যবসায়ী। হেঁটে এসে, একবার হাততালি দিয়ে সেই প্রবল চাপ দূর করল। সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বুঝে গেল, এ-ই সেই কুখ্যাত ‘‘বিপনিবিতান প্রতিনিধি’’।
এখন সে এসেছে মানে, আজকের বিক্রির লক্ষ্য ঘোষণা হবে। আর প্রতিদিন রাতের শেষে, সে এসে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের বিক্রি পরীক্ষা করবে। এক বিপনিবিতানের প্রতিনিধি, তাই শক্তিও যথেষ্ট।
সবাই মনে মনে এসব ভাবছিল। কর সুশান্তও তার দিকে নজর রাখছিল, আর তার সামনে ভেসে উঠল ভূতের তথ্য। এই ভূতের সঙ্গে বিপনিবিতানের গভীর সম্পর্ক। জীবদ্দশায়, তার বাবার হাত ধরে বিপনিবিতান ব্যবসা শুরু হয়েছিল, পরে তার নিজ হাতে এগিয়ে। একদিন, সে তার প্রেমিকার সাথে হোটেলে গিয়ে, হঠাৎ আগুনে আটকা পড়ে মারা যায়। মৃত্যুর পর, তার অসন্তুষ্ট আত্মা শান্তি পায়নি, রূপ নেয় প্রেতাত্মায়। এখানে এসে, জীবনের পুঁজিপতির অভিজ্ঞতায়, আবারও হয়ে উঠেছে বিপনিবিতানের প্রতিনিধি।
তথ্য অনুযায়ী, হোটেলে গোপন প্রেমের কথা তার স্ত্রী আগেই জানত, যদিও কোনও প্রমাণ ছিল না বলে সে স্বীকার করেনি। কিন্তু নিশ্চিত হয়েও, সে বাহিরে দিনরাত ঘুরে বেড়াত, নানাভাবে আনন্দ করত। কর সুশান্ত চুপচাপ এসব তথ্য দেখে গেল। এই বিপনিবিতান ভূত এসে দাঁড়াল, আত্মবিশ্বাসী হাসি ছড়াল—যদিও তার বিকৃত মুখে সেই হাসি আরও ভয়ঙ্কর।
‘‘সবাই, আমি এই বিপনিবিতানের প্রতিনিধি। আজ থেকে আমি তোমাদের কাজের দেখভাল করব! আজ থেকে আমরা সহকর্মী! দুশ্চিন্তা করো না, ভয় পেও না! বিপনিবিতান আমাদের ঘর, সবাই ভাইবোন! একসঙ্গে চেষ্টা করো, আমাদের বিপনিবিতান যাতে আরও বড় হয়!’’
‘‘এবার কাজের সময় জানিয়ে দিই। সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা, টানা তিরিশ দিন, কোনও ভাতা নেই। রাতে বিশ্রাম, যার যার দোকানে ফ্লোরে ঘুমিয়ে নেবে। ক্ষুধা পেলে খাবার বিভাগে যাবে। সেখানে যারা কাজ পেয়েছো, খাওয়ার সময় নিজেরা রান্না করে খাবে, তাতে মনে শান্তি পাবে। তবে, টাকা দিতে হবে। যদিও সবাই আমরা এক পরিবার, সহকর্মী, তাই কর্মচারী দরে সাতচল্লিশ শতাংশ ছাড়ে। যদি কিছু সময় টাকা না থাকে, খাতায় লিখে রাখো, পরে বিক্রির কমিশন থেকে কেটে নেবে।’’
‘‘আজকের বিক্রির লক্ষ্য—এক লাখ শোক-মুদ্রা! সবাইকে আলাদাভাবে এক লাখ করে পুঁছতে হবে, মোট নয়। তবে কোম্পানি তোমাদের খাটিয়ে খালি হাতে ছাড়বে না। প্রতিদিনের বিক্রি থেকে এক শতাংশ শোক-মুদ্রা পাবে মজুরি হিসেবে।’’
এই কথা শুনে, খেলোয়াড়দের মনে ক্ষোভ জেগে উঠল। সারাদিন খেটে এক লাখ টাকা তুলতে হবে, অথচ পাবে মাত্র এক শতাংশ—শুধু একশো! এমন কৃপণতা! তাছাড়া, সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা, কোনও ছুটি নেই, টানা তিরিশ দিন! ভূত হয়েও ৯৯৬ ঘন্টার খাটুনি! ভূত হয়ে গিয়েও কি এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি নেই!
বেশির ভাগ খেলোয়াড়ের মনেই বিদ্রোহের ভাব, কিন্তু এই ভূত প্রতিনিধি শক্তি দেখিয়েছে—ওর সঙ্গে লড়ার সাধ্য নেই। না হলে, সবাই মিলে এই পুঁজিপতি ভূতকে পিটিয়ে ছাড়ত। কিন্তু তাদের বিরক্তি দেখে, প্রতিনিধি ভূত হাসিমুখেই থাকল।
‘‘হয়তো তোমরা ভাবছো, এটা খুব কঠিন, কিন্তু শ্রম ছাড়া কি প্রতিদান পাওয়া যায়? এক শতাংশ কম মনে হলে, বেশি বিক্রি করো, বেশি পাবে! দিনে যদি দশ লাখ বা এক কোটি বিক্রি করো, এক শতাংশ কম হবে? মাস শেষে দেখো কেমন হয়! এমন ভাবনা শুধু হেরে যাওয়া মানসিকতার ফল!’’
সংক্ষেপে চুপ করে থেকে আবার বলল, ‘‘হ্যাঁ, প্রতিযোগিতা! কোম্পানি চাইছে তোমরা প্রতিযোগিতা করো! প্রতিযোগিতা না থাকলে, উন্নতির ইচ্ছা আসে কোথা থেকে? সবাই তো চায় সফলতা, ভালো জীবন, সম্মান, কিন্তু চেষ্টাহীন হলে, কিভাবে সেসব পাবে?’’
তার এই উচ্ছ্বসিত ভাষণ শুনে, খেলোয়াড়দের আরও রাগ বাড়ল। ঠিক করল, এখন থেকে ওকে ‘‘পুঁজিপতি ভূত’’ বলেই ডাকা হবে।
‘‘আজকের মতো এই পর্যন্ত।’’
পুঁজিপতি ভূত তৃপ্তি নিয়ে থামল।
‘‘দোকানের জিনিসের দাম নিজেরা ঠিক করবে। যারা ক্রেতা, তাদের কেনার ক্ষমতাকে অবহেলা কোরো না। পারলে, দাম যতই হোক, তারা কিনবে। আধা ঘণ্টা পর দোকান খুলবে। প্রস্তুতি নাও।’’
সে চলে গেলে, সবাই গালাগাল দিতে লাগল। এ কেমন কাহিনি! এখানে এসেও শুধু কষ্ট আর অপমান। বাস্তবে সবাই চাকরি করত, ৯৯৬-এ বন্দি ছিল, মনে হত এখান থেকে মুক্তি পাবে, কিন্তু এই কাহিনিতে এসে আবার সেই পুরনো যন্ত্রণা। নামেই দোকানদার, আসলে আবারও কারো অধীনে খাটতে হচ্ছে। সবাই বিরক্ত, কিন্তু কিছু করার নেই।
কিছুক্ষণ পর, বাইরে অপেক্ষমান অশুভ আত্মারা হুড়মুড় করে ঢুকতে লাগল। প্রবল শীতল বাতাস, কান্নার শব্দে দোকান ভর্তি হয়ে উঠল। এ আর সাধারণ কাহিনির মতো নয়, কয়েকশো ভূত প্রবেশ করতেই সারা বিপনিবিতান ভয়াবহ হয়ে উঠল। সবাই এই আত্মাদের উপস্থিতিতে গা ছমছমে অনুভব করল, কপালে ঘাম ঝরল। সবাই হাতে প্রস্তুত বিশেষ জিনিস ধরল, যা গত কাহিনি থেকে বাঁচার পুরস্কার। এমনকি, শিশুদের প্রস্রাব বা মাসিক প্যাডও কারও কাছে আছে, দরকারে জীবন রক্ষা করতে পারে। সবাই সতর্ক, চারপাশে নজর রাখছে, ভূতদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে। কেউই হুট করে কিছু করছে না—কেননা কাহিনির নিয়মও স্পষ্ট নয়।
এদিকে, কর সুশান্ত নিজের ছোট দোকানে চুপচাপ বসে পরিস্থিতি দেখছিল। সে লক্ষ করল, আত্মারা শুধু ঘুরছে, কেউ দোকানে আসছে না, কিছু কেনার আগ্রহও নেই। বুঝল, এদের সহজে খুশি করে বিক্রি করা যাবে না। কর সুশান্ত ভাবল, ‘‘তাহলে আমাকেই এগিয়ে যেতে হবে!’’
সে দেখল, এক নারী আত্মা, যার মাথার অর্ধেক চেপে গেছে, গলা নব্বই ডিগ্রি বেঁকে, হাত-পায়ের হাড় বেরিয়ে আছে, তার দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছে। সে সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে গেল। অপেক্ষায় সময় নষ্ট না করে নিজেই শুরু করাই ভালো!
‘‘ওই সুন্দরী দিদি, একটু দাঁড়ান তো! আপনাকে একটা অমূল্য জিনিস দেখাব!’’
——————
আজ একটু দেরিতে লিখে শেষ করলাম।
সবাই ভোট দাও।