অধ্যায় ০৩৭: অতিষ্ঠ করে পাগল করে তুলেছে?
যে মেয়েটি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল সেই দুর্বল, ফ্যাকাসে ছেলেটির দিকে, তার দিকে উৎসাহের দৃষ্টিতে বলল, ‘‘দ্রুত সেরে ওঠো, শরীর ঠিক না থাকলে তো লড়াইয়ের শক্তি থাকবে না। বিপ্লব করার মতো সাধ্য না থাকলে কীভাবে লড়বে, কীভাবে রু সুচন্দা ও তার মেয়েকে তাড়াবে?’’
দ্বিতীয় ভাইয়ের ফ্যাকাসে মুখে বিস্ময়ের ছায়া ফুটে উঠল। ছোট ভাই ততক্ষণে তার মুখে ভাতের ফান পাঠিয়ে দিচ্ছিল, ‘‘দ্বিতীয় দাদা, গত রাতে আমরা যখন বাড়ি ফিরলাম, সৎমা আবারও আমাদের বিষ খাওয়াতে চেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বড় দিদির বুদ্ধিতে, ইয়েন সুচন্দা নিজেই নিজের ক্ষতি করে বসল।’’
দ্বিতীয় ভাই চুপচাপ ফান খেতে লাগল, যেন হঠাৎ করে এত তথ্য হজম করতে পারছে না। তার জন্য সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ছিল... বড় দিদির এই পরিবর্তন।
রু সুচন্দা ঠিকই বলেছিল, বড় দিদি যেন অন্য মানুষ হয়ে গেছে। আগে সে, বাবার মতোই, খুবই নির্লিপ্ত ছিল, ভাইদের জীবন-মৃত্যু নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা করত না, কখনও কখনও তো ইয়েন সুচন্দা ও তার বোনদের তোষামোদ করতে গিয়ে উল্টো ভাইদেরই কষ্ট দিত।
বড় দিদি দ্বিতীয় ভাইয়ের মনের সব অস্থিরতা উপেক্ষা করে, চোর-ডাকাতদের মতো পা তুলে, থুতনি ছুঁয়ে নিজেই বলে উঠল, ‘‘ওই মা-মেয়েকে তাড়ানোটা জরুরি, নইলে আমাদের আর ভালো দিন আসবে না!’’
ছোট ভাই হতাশভাবে বলল, ‘‘তাড়ানো যাবে না, বাবা কখনোই রাজি হবে না।’’
‘‘তাহলে তাকেও তাড়িয়ে দিই!’’ বড় দিদি কাঁধ ঝাঁকাল। এ যেন তেমন কোনো বড় ব্যাপারই না।
ইয়েন চাংগুই, সেই স্বার্থপর, নির্দয়, অপদার্থ মানুষটা বাঁচা মানেই বাতাস নষ্ট করা। তার ভাইয়েরা দিদির কথা শুনে হতবাক হয়ে গেল।
বাবাকে তাড়িয়ে দেওয়া? বরং বাবা তাদের তাড়িয়ে দিলে তবু ঠিক ছিল!
বড় দিদি যখন দেখল সবাই তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, খানিকটা বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘‘আমি কি ভুল বললাম?’’
ছোট ভাই সন্দিগ্ধ গলায় বলল, ‘‘বাড়িটা তো বাবার!’’
‘‘তাই নাকি...’’ বড় দিদি একটু চিন্তিত দেখাল, ‘‘ঠিক আছে, আমাদের যখন বয়স কম, তখনো তো থাকতে পারি, পরে আমরা নিজেরা টাকা রোজগার করব, তখন নতুন বাড়ি কিনে নেব।’’
আসলেই তো সে ভেবেছিল বাড়িটা দখল করবে, ইয়েন চাংগুই-এর মতো লোকের জন্য সহানুভূতি দেখানোর কিছু নেই। তাছাড়া, সে তো শহরে চাকরি করে, কয়েক বছর পর একটা বাড়ি পেতে পারে, তখন আর গ্রামের পুরনো বাড়ির দরকারই হবে না।
তবে এসব কথা বললে ছোটদের খারাপ দিকে টেনে নেওয়া হবে, তাই দিদি কথাটা বদলে নিল।
এদিকে কিছুটা খেয়ে দ্বিতীয় ভাই ঠান্ডা গলায় বলল, ‘‘যদি রু সুচন্দা ও তার মেয়েকে তাড়ানো যায়, বাবার কোনো সমস্যা হবে না, ও তো খুব কমই বাড়িতে থাকে।’’
এই বাবার উপস্থিতি তাদের জীবনে সব সময়ই অপ্রয়োজনীয় ছিল।
বড় দিদি আঙুলে চটক দিয়ে বলল, ‘‘আমারও ঠিক তাই মনে হয়। আমরা ভাইবোন একসাথে থাকলে, যা চাইব, তাই পারব, চল, লড়াই করি!’’
দ্বিতীয় ভাই: ‘‘...’’
ছোট ভাই: ‘‘...’’
কেউ সাড়া না দেওয়ায় বড় দিদি একটু অস্বস্তি কাটাতে কাশি দিল, ‘‘তোমরা এখানেই থাকো, আমি একটু রু সুচন্দার সঙ্গে কথা বলে আসি।’’
এই বলে সে উঠে রওনা দিল ওয়ার্ড থেকে।
বড় দিদি বেরিয়ে যেতেই দ্বিতীয় ভাই জিজ্ঞাসা করল, ‘‘সে কি সত্যিই পাগল হয়ে গেছে?’’
ছোট ভাই মাথা চুলকে বলল, ‘‘আমি... আমি জানি না...’’
‘‘একেবারে অন্য মানুষ হয়ে গেছে যেন,’’ দ্বিতীয় ভাই বিছানায় চিত হয়ে পড়ে, আপনমনে বলল।
অদ্ভুতই তো বটে। তার কথাবার্তা, আচরণ, এমনকি তাকানোর ভঙ্গিও একদম বদলে গেছে। সে কি সত্যিই পাগল হয়ে গেছে?
ছোট ভাই বলল, ‘‘তবু আমার এখনকার দিদিকে ভালো লাগে, সে আমাকে খেয়াল রাখে, আমাকে রক্ষা করে, আমাকে খেতে দেয়।’’
দ্বিতীয় ভাই তাকে একপলক দেখে ঠাট্টা করে বলল, ‘‘হয়তো তার মনে কোনো খারাপ পরিকল্পনা আছে, আমাদের ব্যবহার করতে চায় রু সুচন্দা মা-মেয়ের বিরুদ্ধে, তুই একটু সাবধান হবি, বোকামি করিস না।’’
ছোট ভাই ঠোঁট ফুলিয়ে মাথা নিচু করল, কী বলবে বুঝতে পারল না। সে তো এখনো ছোট, অনেক কিছুই বোঝে না। শুধু জানে, তার এখনকার বড় দিদি তার জন্য ভালো।
কিন্তু যদি হঠাৎ দিদি আবার আগের মতো খারাপ হয়ে যায়? এই ভেবে ছোট ভাইয়ের বুক দুরুদুরু করতে লাগল।
ইশ, যদি বড় দিদি চিরকাল এমনই ভালো থাকত!