পর্ব ২৫: গ্রন্থের ভেতরে প্রবেশকারীর সুবিধা??
এখনও পর্যন্ত ইয়ালি সম্পূর্ণ নির্বিকার ছিল, অলসভাবে শরীর টেনে একটা হাই তুলল, ঘুম পাচ্ছিল। সে ইয়ি ছোট ভাইকে বলল, ‘‘আজ রাতে তুমি ইয়ি শুচেন আর ইয়ি ছুনলিয়ানের ঘরে শোবে।’’ তারপর সে একটু টয়লেট পেপার নিয়ে দু’ভাগ করে ছোট ছোট বল বানিয়ে ছোট ভাইয়ের কানে গুঁজে দিল, শেষমেশ তো সে একটা শিশু, ইয়ালি সত্যিই চাইত এইসব অশ্লীল কথাগুলো তার ওপর যতটা সম্ভব কম প্রভাব ফেলুক।
ইয়ি ছোট ভাই ইয়ালির জামার কোণা ধরে বলল, ‘‘দিদি...’’
‘‘হ্যাঁ?’’
‘‘আমি তোমার সঙ্গে একসাথে শুতে চাই।’’ ছোট ভাইয়ের মনে খুব ভয়, ভয় ছিল লু ছুইয়ে আর তার মেয়ে-জামাইরা পাগলা কুকুরের মতো ওদিকের দরজা ভেঙে এসে ওকে গিলে ফেলবে।
ইয়ালি মাথা নাড়ল, ‘‘হ্যাঁ, ঠিক আছে!’’ ইয়ি শুচেন বোনদের ঘরে ঠিক দুইটা খাট ছিল, শোয়া যাবে, আসলে অন্য কোথাও মানুষ শুতে পারত না।
আগে ইয়ি পরিবারের ভাইবোনেরা সহ্য করত, কিন্তু এখন ইয়ালি আর মানতে পারছিল না।
ইয়ালি ছোট ভাইয়ের কষ্টজর্জর মুখের দিকে তাকাল, আবার ঠান্ডা তোয়ালে দিয়ে ওর মুখ মুছে দিল। ইয়ি ছোট ভাই স্পষ্টতই মানসিক আর শারীরিকভাবে ক্লান্ত, পরিষ্কার, সুন্দর গন্ধের কম্বলের মধ্যে বড় দিদির মমতা অনুভব করে, কিছুক্ষণ পরেই ঘুমিয়ে পড়ল।
ইয়ালি অপেক্ষা করল সে ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্ত, তারপর কাঠের বাক্স ঘেঁটে ইয়ি শুচেন বোনদের জামাকাপড় বের করল, যেটা যার মাপে হবে সেটা পরে নিল, তারপর গোসলঘরে গিয়ে গরম পানিতে একটা স্নান করে নিল। পাহাড় থেকে ফিরে আসার পর থেকে শরীর এতটাই ময়লা হয়েছিল যে সাফ হওয়া দরকার ছিল।
স্নান শেষ করে জামা বদলে নিল, বাইরে কে কাঁদছে বা চিৎকার করছে সেই নিয়ে মাথা ঘামাল না, শুয়ে বিশ্রাম নিতে লাগল, শক্তি সঞ্চয় করছিল। এই যুগে বইয়ে এসে এখন পর্যন্ত সে অনেক কিছু দেখে ফেলেছে, হঠাৎ ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ল, চোখ বন্ধ করতেই হঠাৎ চোখের সামনে তীব্র সাদা আলো ঝলসে উঠল, মস্তিষ্কে যেন বিদ্যুৎ তরঙ্গ বয়ে গেল, তারপরই শোনা গেল বরফশীতল যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর:
‘‘পাঠক ক্ষোভ সিস্টেমে আপনাকে স্বাগতম।’’
ইয়ালি এক ঝটকায় কাঁপে উঠল, হঠাৎ চোখ মেলে উঠে বসল, দেখল সে এক অদ্ভুত স্থানে উপস্থিত। চারপাশে তারার নদী প্রবাহিত হচ্ছে, ইয়ি ছোট ভাই নেই, কেবল সামনে ভাসছে এক লম্বা উজ্জ্বল স্ক্রিন, সেখানে সাবটাইটেল ভেসে উঠছে।
ইয়ালি মনে মনে বলল, এ আবার কী ব্যাপার? নাকি দেরিতে এসে বইয়ের নায়িকার জন্য বিশেষ কোনো সুবিধা?
এই কথা ভাবতেই ইয়ালির মনে একটু উত্তেজনা ছড়াল।
সিস্টেম নিজের মতো করে পরিচয় দিল:
‘‘একটি বই রচনা শেষ হলে, কেউ খুশি হয় কেউ দুঃখ পায়, যখন পাঠকদের ক্ষোভের মাত্রা সিস্টেমের নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষোভ মোচনের ফাংশন চালু হয়।’’
ইয়ালির ঠোঁট কাঁপে উঠল। সত্যিই, তাকে ওই বাজে বইটা পড়াই উচিত হয়নি! তার ইংরেজি টুলবই পড়া কি বেশি ভালো ছিল না?
‘‘বাস্তবে তুমি ‘আশির দশকের দলের আদরের ছোট মেয়ে’র সমাপ্তি নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলে, মানসিক অবসাদের মধ্যে দুর্ঘটনায় পড়ে এখন কোমায় আছো, সিস্টেম তোমার প্রবল ক্ষোভ শনাক্ত করে তোমাকে বেছে নিয়েছে।’’
ইয়ালি মনে মনে বলল, আমি তো বেশ দুর্ভাগা মেয়ে।
সম্ভবত সে-ই প্রথম যে বই পড়ে রাগে দুর্ঘটনায় পড়ে এমন দুর্ভাগার দলভুক্ত।
‘‘সিস্টেম তোমার মেধা ও লড়াইয়ের ক্ষমতা প্রশংসা করছে, নানা মূল্যায়নের পর তোমাকে এই বইয়ের কাজ শেষ করার জন্য বেছে নিয়েছে।’’
অর্থাৎ, কোনো সাধারণ মানুষ এটা করার যোগ্যতা পায় না!
ইয়ালি জিজ্ঞাসা করল, ‘‘কী কাজ?’’
‘‘এই বইতে নায়ক নম্বর দুই মো নানচিয়ানের চরিত্রটা এত সফলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যে, তার দ্বৈত স্বভাব, ভালোবাসায় পরাজিত হয়ে উন্মাদ হয়ে মৃত্যুবরণ করা ট্র্যাজিক পরিণতি—সব মিলিয়ে নব্বই শতাংশের বেশি পাঠকের হৃদয় ভেঙে গেছে...’’
ইয়ালি মনে মনে চায় না স্বীকার করতে, তার মধ্যে সেই ভাঙা হৃদয়ও আছে!!!
‘‘কাজ: প্রধান খলনায়ক পুরুষ চরিত্র মো নানচিয়ানকে নায়িকা ইউন ইউনের সঙ্গে সুখী মিলনের দিকে導 করতে হবে, যাতে সে খুশি থাকে!’’
‘‘উদ্দেশ্য: সিস্টেমের পাঠক ক্ষোভের মাত্রা শূন্যতে নামাতে হবে।’’
ইয়ালি মনে মনে অবজ্ঞাভরে বলল, ‘‘আমি যদি না-ই চাই?’’
তার তো মাথার কোনো অসুখ নেই যা তাকে এসব করতে বাধ্য করবে!
সে তো আসার পরেই মো নানচিয়ানের হাতে কবর হতে হতে বেঁচে গেছে, এখন আবার তাকে সাহায্য করতে হবে যাতে মো নানচিয়ান আর নায়িকা একসঙ্গে সুখী হয়!!
হাই—
নিজ হাতে মরতে না দিলে, এটাই তো তার সবচেয়ে বড় দয়া, নয় কি?
‘‘কাজ শেষ করলে বাস্তব জগতে ফেরার সুযোগ পাবে।’’
ইয়ালি মুহূর্তেই মনস্থ করল, তারপর আবার দ্বিধায় পড়ল, ‘‘কিন্তু আমি তো বাস্তবে কোমায় পড়ে আছি...’’
তখন তো আমি অচেতন, ফিরে গিয়ে লাভ কী?
‘‘তুমি আবার আগের মতো সুস্থ হয়ে উঠবে।’’
ইয়ালির মনে আবার প্রবল ইচ্ছা জাগল।
‘‘যদি সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত হতে রাজি থাকো, তাহলে স্ক্রিনে সম্মতি বোতামে চাপ দাও।’’
স্ক্রিনে সঙ্গে সঙ্গে ‘‘সম্মতি’’ আর ‘‘অসম্মতি’’ লেখা ফুটে উঠল।
ইয়ালি মন খারাপ করে বলল, ‘‘যদি অসম্মতি দিই, তাহলে কি আর ফেরত যেতে পারব না?’’
কী দুঃখ! কেন তাকে ওই নীচ পুরুষ আর নায়িকাকে সুখী সমাপ্তি দিতে হবে?
রাগ হচ্ছে!
শত্রুর প্রতিশোধ না নিয়ে থাকা তার স্বভাব নয়!
‘‘যদি অসম্মতি দাও, তাহলে এখন তোমার আত্মা বাস্তব জগতের দেহের সঙ্গে সঙ্গে মরবে।’’
ইয়ালি চমকে গেল, একটু ভেবে হাত বাড়িয়ে বোতামে চাপ দিতে গিয়ে আবার থেমে গেল, ‘‘যদি কাজটা না পারি?’’
বইয়ে মো নানচিয়ান তো নায়িকাকে খুশি করার জন্য সবকিছু করেছে, শেষ পর্যন্ত তো তাকেই নায়কের বিয়ের পোষাক পড়তে হয়েছে!
পুরুষ-নারী চরিত্রে তো প্রধান চরিত্রের ভাগ্য লেখা, সে-ই বা কী বদলাতে পারবে?